ডলার এনডোর্সমেন্ট ২০২৬ সালের আপডেট তথ্য
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
বর্তমান সময়ে বিদেশ ভ্রমণ, অনলাইন পেমেন্ট কিংবা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ডলার এনডোর্সমেন্ট একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আপনি ইচ্ছেমতো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতে পারেন না; এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত নিয়ম মেনে পাসপোর্টে ডলার এনডোর্সমেন্ট করাতে হয়।
অনেকেই এখনও ডলার এনডোর্সমেন্ট কী, কত ডলার পর্যন্ত করা যায়, কোন ব্যাংক থেকে করা সুবিধাজনক- এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না।
তাই এই লেখায় ২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী ডলার এনডোর্সমেন্টের নিয়ম, সীমা, কার্ড ও ব্যাংকভিত্তিক তথ্য সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
ডলার এনডোর্সমেন্ট কি? (What is Dollar Endorsement?)
সহজ কথায়, আপনার পাসপোর্টের বিপরীতে আপনি কত ডলার খরচ করার অনুমতি পাচ্ছেন, তার অফিসিয়াল রেকর্ড বা সিল দেওয়াকে ডলার এনডোর্সমেন্ট বলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি নাগরিক বছরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাথে রাখতে বা খরচ করতে পারেন।
আপনি যখন কোনো অনুমোদিত ব্যাংক বা মানি চেঞ্জার থেকে ডলার কেনেন বা কার্ডে লোড করেন, তখন তারা আপনার পাসপোর্টের নির্দিষ্ট পাতায় ডলারের পরিমাণ লিখে সিল ও স্বাক্ষর করে দেয়। এটিই হলো এনডোর্সমেন্ট।
এটি মূলত আপনার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের একটি আইনি বৈধতা। এনডোর্সমেন্ট ছাড়া ডলার সাথে রাখা বা বিদেশে নিয়ে যাওয়া আইনত দণ্ডনীয়।
ডলার এনডোর্সমেন্ট করার নিয়ম
ডলার এনডোর্সমেন্ট করার প্রক্রিয়া এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। আপনি চাইলে নগদ ডলার নিতে পারেন অথবা আপনার ডুয়াল কারেন্সি কার্ডে (ডেবিট/ক্রেডিট/প্রিপেইড) ডলার লোড করতে পারেন।
পাসপোর্টে ডলার এনডোর্স করার সাধারণ ধাপগুলো:
-
বৈধ পাসপোর্ট: আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ৬ মাস থাকতে হবে।
-
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ড: আপনার যদি কোনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে সেই ব্যাংক থেকেই এনডোর্স করা সবচেয়ে সহজ।
-
আবেদন ফর্ম: ব্যাংকে গিয়ে এনডোর্সমেন্টের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করতে হয়।
-
ডলারের উৎস: আপনি নগদ টাকা দিয়ে ডলার কিনতে পারেন অথবা আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা ডলারে কনভার্ট করে কার্ডে নিতে পারেন।
-
ভ্রমণ কোটা (Travel Quota): সার্কুলার অনুযায়ী, প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সর্বোচ্চ ১২,০০০ মার্কিন ডলার এনডোর্স করতে পারেন।
কার্ডে ডলার এনডোর্সমেন্ট
বর্তমানে নগদ ডলার বহনের চেয়ে কার্ড ব্যবহার অনেক বেশি নিরাপদ ও সুবিধাজনক।
-
ডুয়াল কারেন্সি কার্ড: আপনার যদি একটি ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড থাকে, তবে আপনি ব্যাংকে গিয়ে আপনার ট্রাভেল কোটা এনডোর্স করে নিতে পারেন।
-
সুবিধা: কার্ডে এনডোর্স করা থাকলে আপনি বিদেশে গিয়ে এটিএম থেকে ডলার তুলতে পারবেন, শপিং মলে পেমেন্ট করতে পারবেন এবং এমনকি দেশ থেকে ফেসবুক বা ইউটিউবে বুস্ট করার মতো অনলাইন পেমেন্টও করতে পারবেন।
-
প্রক্রিয়া: ব্যাংক আপনার পাসপোর্টে বার্ষিক ১২,০০০ ডলারের সিল দিয়ে দিবে এবং আপনার কার্ডের অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে খুলে দেবে।
ইসলামী ব্যাংক ডলার এন্ডোর্সমেন্ট (Islami Bank Dollar Endorsement)
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBPLC) তাদের গ্রাহকদের জন্য শরীয়াহ ভিত্তিক ডুয়াল কারেন্সি কার্ড (যেমন: খিদমাহ ক্রেডিট কার্ড বা প্রিপেইড কার্ড) প্রদান করে।
সেলফিন (CellFin) অ্যাপ:
ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা সেলফিন অ্যাপের মাধ্যমেও কার্ড ম্যানেজমেন্ট করতে পারেন। তবে পাসপোর্টে ফিজিক্যাল এনডোর্সমেন্টের জন্য আপনাকে নিকটস্থ এডি (Authorized Dealer) শাখায় যেতে হবে।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র:
পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক হলে আপনার কার্ড বা অ্যাকাউন্টের তথ্য।
খিদমাহ কার্ড:
যারা হজ বা ওমরাহ করতে যান, তাদের জন্য ইসলামী ব্যাংকের খিদমাহ কার্ডে ডলার এনডোর্সমেন্ট অত্যন্ত জনপ্রিয়।
সোনালী ব্যাংক ডলার এন্ডোর্সমেন্ট
সরকারি ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংক পিএলসি (Sonali Bank PLC) থেকে ডলার এনডোর্সমেন্ট করা বেশ নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী। বিশেষ করে যারা সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণ করেন বা হজ্জ ও ওমরাহ পালনে যান, তাদের জন্য সোনালী ব্যাংক প্রথম পছন্দ।
সোনালী ব্যাংকে ডলার এনডোর্সমেন্ট করার বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
এনডোর্সমেন্টের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সোনালী ব্যাংকের যেকোনো অনুমোদিত ডিলার (AD) শাখা থেকে আপনি ডলার এনডোর্স করতে পারবেন। এর জন্য যা যা লাগবে:
-
মূল পাসপোর্ট: অবশ্যই বৈধ পাসপোর্ট এবং এর ফটোকপি।
-
ভিসা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে): যে দেশে যাচ্ছেন তার বৈধ ভিসার কপি (যদি আগেই ভিসা পেয়ে থাকেন)।
-
সোনালী ব্যাংক কার্ড বা নগদ টাকা: আপনি যদি কার্ডে এনডোর্স করতে চান তবে আপনার সোনালী ব্যাংকের ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড থাকতে হবে। অন্যথায় নগদ টাকা দিয়ে ডলার কিনলে তারা পাসপোর্টে এনডোর্স করে দিবে।
-
আবেদনপত্র: ব্যাংকে নির্ধারিত এনডোর্সমেন্ট ফর্ম পূরণ করতে হবে।
-
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): গ্রাহকের এনআইডি কার্ডের ফটোকপি।
সোনালী ব্যাংক কার্ডে এনডোর্সমেন্ট
সোনালী ব্যাংকের আধুনিক Mastercard/Visa Dual Currency কার্ডগুলোতে ট্রাভেল কোটা এনডোর্স করা যায়।
-
আপনি ব্যাংকে গিয়ে আপনার পাসপোর্ট জমা দিলে তারা বার্ষিক ১২,০০০ ডলারের (বা আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী) এনডোর্সমেন্ট সিল মেরে দিবে।
-
এরপর আপনার কার্ডের E-commerce (Global) পার্টটি চালু হয়ে যাবে, যা দিয়ে আপনি বিদেশের এটিএম থেকে টাকা তোলা বা পেমেন্ট করতে পারবেন।
খরচ ও ফি
-
সোনালী ব্যাংকে এনডোর্সমেন্ট ফি সাধারণত অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নামমাত্র ফি বা বিনামূল্যে এই সেবা দেওয়া হয়। তবে বর্তমান এক্সচেঞ্জ রেট অনুযায়ী ডলারের দাম পরিশোধ করতে হবে।
-
নোট: ক্যাশ ডলারের ক্ষেত্রে ব্যাংকে ডলারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সাপেক্ষে আপনি নগদ ডলার পেতে পারেন।
সোনালী ব্যাংকের কোন শাখায় যাবেন?
সোনালী ব্যাংকের সব শাখায় ডলার এনডোর্সমেন্ট হয় না। আপনাকে অবশ্যই Authorized Dealer (AD) শাখায় যেতে হবে। বড় শহরগুলোর প্রধান শাখা এবং বিশেষায়িত বৈদেশিক বাণিজ্য শাখাগুলোতে এই সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন:
-
মতিঝিল লোকাল অফিস।
-
প্রধান কার্যালয় সংলগ্ন শাখা।
-
বিমাবন্দর বা কাস্টমস সংলগ্ন বিশেষ শাখা।
সোনালী ব্যাংকে ডলার এনডোর্সমেন্টের সুবিধা
-
বিনিময় হার: বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় সোনালী ব্যাংকে ডলারের বিনিময় হার (Exchange Rate) সাধারণত কিছুটা কম বা প্রতিযোগিতামূলক থাকে।
-
হজ্জ ও ওমরাহ যাত্রী: হজ্জ ও ওমরাহ যাত্রীদের জন্য সোনালী ব্যাংকের বিশেষ বুথ ও দ্রুত এনডোর্সমেন্ট সুবিধা রয়েছে।
-
সরকারি ভ্রমণ: সরকারি কর্মকর্তাদের (G.O এর বিপরীতে) ডলার এনডোর্সমেন্টের জন্য সোনালী ব্যাংক সবচেয়ে সুবিধাজনক।
পরামর্শ: সোনালী ব্যাংকে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনার পাসপোর্টটি ডিজিটাল এবং সব তথ্য সঠিক আছে কিনা। এছাড়া আপনি যদি বর্তমান বছরের ১২,০০০ ডলারের কোটার কিছু অংশ অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ইতিমধ্যে ব্যবহার করে থাকেন, তবে সেই তথ্যও ব্যাংককে জানাতে হবে।
FAQs: ডলার এনডোর্সমেন্ট নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা
ডলার এনডোর্সমেন্ট কোথায় করা যায়?
যেকোনো অনুমোদিত ডিলার (AD) ব্যাংক শাখা (যেমন: ইসলামী ব্যাংক, ইবিএল, সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ইত্যাদি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত লাইসেন্সধারী মানি চেঞ্জার থেকে ডলার এনডোর্স করা যায়।
ডলার এনডোর্সমেন্ট এর মেয়াদ কতদিন?
২০২৬ সালের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, আপনি আপনার পাসপোর্টের মেয়াদের পুরো সময়ের জন্য একবারেই এনডোর্সমেন্ট করে নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, এক বছরে আপনি ১২,০০০ ডলারের বেশি খরচ করতে পারবেন না। প্রতি বছরের ১লা জানুয়ারি আপনার কোটা পুনরায় রিনিউ হয়।
সর্বনিম্ন কত ডলার এনডোর্সমেন্ট করা যায়?
সর্বনিম্ন এনডোর্সমেন্টের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। আপনি চাইলে ১০ ডলার থেকে শুরু করে আপনার প্রয়োজন মতো যেকোনো পরিমাণ এনডোর্স করতে পারেন। তবে ব্যাংকগুলো সাধারণত ছোট অংকের চেয়ে একটু বড় অংকের এনডোর্সমেন্টকে উৎসাহিত করে।
ডলার এনডোর্সমেন্ট ফি কত?
২০২৬ সালের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক মানি চেঞ্জারদের জন্য এনডোর্সমেন্ট ফি সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের নিয়মিত গ্রাহকদের জন্য এই ফি মওকুফ করে থাকে অথবা কার্ডের বাৎসরিক ফি-র সাথেই এটি অন্তর্ভুক্ত থাকে।
উপসংহার
ডলার এনডোর্সমেন্ট কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি আপনার বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতিকে করে তোলে নিরবচ্ছিন্ন। ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন ঘরে বসেই কার্ডের মাধ্যমে ডলার খরচ করা সম্ভব হলেও পাসপোর্টে এনডোর্সমেন্টের সিলটি এখনো অপরিহার্য।
আপনি যদি বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বা অনলাইন পেমেন্ট করতে চান, তবে আজই আপনার নিকটস্থ ব্যাংকে গিয়ে পাসপোর্ট এনডোর্স করিয়ে নিন।

আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
