ইসলামী ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা: ২০২৬
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
ইসলামী ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা মূলত আবেদনকারীর নির্দিষ্ট আর্থিক ও ব্যক্তিগত মানদণ্ডের উপর নির্ভর করে। সাধারণত বয়সসীমা, মাসিক ন্যূনতম আয়, চাকরির ধরন (সরকারি, বেসরকারি বা ব্যবসায়ী), চাকরির অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যমান ব্যাংক হিসাবের লেনদেন ইতিহাস যাচাই করা হয়। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়ের প্রমাণপত্র ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট বাধ্যতামূলক।
আজকের এই ব্লগে আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইসলামী ব্যাংক খিদমাহ ক্রেডিট কার্ড কী?
ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড মূলত ‘খিদমাহ কার্ড’ নামে পরিচিত। এটি সম্পূর্ণ শরীয়াহ সম্মত ‘উযরাহ’ (Ujrah) বা নির্দিষ্ট ফি ভিত্তিক মডেলে পরিচালিত। প্রচলিত ব্যাংকের মতো এখানে সুদের কারবার নেই, বরং কার্ড ব্যবহারের জন্য গ্রাহককে নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জ প্রদান করতে হয়।
খিদমাহ কার্ডের ধরন ও সীমা (Limit)
ইসলামী ব্যাংক সাধারণত তিন ধরনের খিদমাহ কার্ড অফার করে:
-
সিলভার কার্ড: লিমিট ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
-
গোল্ড কার্ড: লিমিট ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
-
প্লাটিনাম কার্ড: লিমিট ২,০০,০০০ টাকা বা তার বেশি (যোগ্যতা সাপেক্ষে)।
ইসলামী ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা
ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পেতে হলে আপনাকে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। এগুলো মূলত আপনার আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং পরিশোধের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
১. পেশাগত যোগ্যতা
-
চাকরিজীবী: সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মকর্তা হতে হবে।
-
ব্যবসায়ী: ন্যূনতম ২ বছরের ব্যবসার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং ট্রেড লাইসেন্স আপডেট থাকতে হবে।
-
পেশাজীবী: ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২. আয়ের সীমা
ক্রেডিট কার্ডের জন্য আয়ের একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে:
-
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে: মাসিক ন্যূনতম বেতন সাধারণত ৩০,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে হয়।
-
ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে: বাৎসরিক লেনদেন এবং নিট মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক কার্ড প্রদান করে। সাধারণত বার্ষিক আয় ৩-৪ লাখ টাকার উপরে থাকা বাঞ্ছনীয়।
৩. বয়স ও নাগরিকত্ব
-
আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
-
বয়স সাধারণত ২১ বছর থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
৪. ক্রেডিট স্কোর (CIB Report)
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি (CIB) রিপোর্টে আপনার নাম খেলাপি ঋণের তালিকায় থাকা যাবে না। পূর্বের কোনো লোন বা কার্ডের কিস্তি বকেয়া থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Required Documents)
আবেদন করার সময় নিচের কাগজগুলো সাথে রাখা জরুরি:
| সাধারণ প্রয়োজনীয় কাগজ | চাকরিজীবীদের জন্য | ব্যবসায়ীদের জন্য |
| ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি | গত ৩-৬ মাসের বেতন বিবরণী (Pay Slip) | হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স |
| এনআইডি (NID) কার্ডের ফটোকপি | অফিস আইডি কার্ডের কপি | গত ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট (ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক) |
| ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট ও রিটার্ন জমার কপি | স্যালারি সার্টিফিকেট বা অথরাইজেশন লেটার | পার্টনারশিপ ডিড (যদি থাকে) |
| ইউটিলিটি বিলের কপি (বিদ্যুৎ/গ্যাস) | ব্যাংক স্টেটমেন্ট (৩-৬ মাস) | মেমোরেন্ডাম অফ আর্টিকেলস (লিমিটেড কোম্পানি হলে) |
কেন নেবেন ইসলামী ব্যাংক খিদমাহ কার্ড? (সুবিধাসমূহ)
ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের এমন কিছু বিশেষ সুবিধা আছে যা একে অন্য ব্যাংক থেকে আলাদা করে:
সম্পূর্ণ সুদবিহীন:
এটি শরীয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত, তাই এখানে কোনো চক্রবৃদ্ধি সুদ নেই।
নগদ উত্তোলন সুবিধা:
আপনার লিমিটের ৫০% পর্যন্ত নগদ টাকা এটিএম থেকে উত্তোলন করা যায়।
হজ ও ওমরাহ পেমেন্ট:
এই কার্ড দিয়ে হজ বা ওমরাহর খরচ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়।
বিলে ছাড় ও অফার:
বিভিন্ন শপিং মল, রেস্টুরেন্ট এবং হাসপাতালে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়।
ফ্রি সাপ্লিমেন্টারি কার্ড:
প্রথম সাপ্লিমেন্টারি কার্ডটি সাধারণত ফ্রি পাওয়া যায়।
আবেদন করার পদ্ধতি
ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের জন্য আপনি দুইভাবে আবেদন করতে পারেন:
সরাসরি ব্রাঞ্চে গিয়ে:
আপনার নিকটস্থ ইসলামী ব্যাংক শাখায় গিয়ে ‘কার্ড ডিভিশন’ বা ‘ইনভেস্টমেন্ট ডেস্কে’ যোগাযোগ করুন। সেখানে ফরম পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন।
অনলাইনে আবেদন:
ইসলামী ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা সেলফিন (CellFin) অ্যাপের মাধ্যমেও প্রাথমিক আবেদন করা সম্ভব। তবে ভেরিফিকেশনের জন্য ব্যাংক প্রতিনিধি আপনার সাথে যোগাযোগ করবেন।
ইসলামী ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড চার্জ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBL) এর খিদমাহ ক্রেডিট কার্ডের চার্জগুলো সাধারণত প্রচলিত ব্যাংকের মতো সুদভিত্তিক নয়, বরং এগুলো বিভিন্ন ফি বা সার্ভিস চার্জ হিসেবে নির্ধারিত হয়।
২০২৬ সালের বর্তমান তথ্যানুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের প্রধান চার্জগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
বার্ষিক ফি (Annual/Renewal Fee)
কার্ডের ধরণ অনুযায়ী বার্ষিক ফি ভিন্ন হয়ে থাকে:
-
সিলভার কার্ড: ৫০০ – ১,০০০ টাকা (+১৫% ভ্যাট)।
-
গোল্ড কার্ড: ১,৫০০ – ২,৫০০ টাকা (+১৫% ভ্যাট)।
-
প্লাটিনাম কার্ড: ৩,০০০ – ৫,০০০ টাকা (+১৫% ভ্যাট)।
টিপস: বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক বার (যেমন ১৫ বার) কার্ড ব্যবহার করলে অনেক সময় বার্ষিক ফি মওকুফ (Waiver) করা হয়।
বিলম্ব ফি (Late Payment Fee)
যদি আপনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ন্যূনতম পাওনা (Minimum Due) পরিশোধ না করেন, তবে আপনাকে বিলম্ব ফি দিতে হবে। এটি সাধারণত:
-
সিলভার/গোল্ড: ৫০০ টাকা।
-
প্লাটিনাম: ৭০০ – ১,০০০ টাকা।
(এর সাথে ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য হবে)।
নগদ উত্তোলন চার্জ (Cash Withdrawal Fee)
এটিএম থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রতিবার নির্দিষ্ট চার্জ কাটা হয়:
-
আপনার উত্তোলিত টাকার ওপর সাধারণত ২% বা সর্বনিম্ন ২০০-৩০০ টাকা (যেটি বেশি) চার্জ হিসেবে কাটা হয়।
অন্যান্য ফি
-
কার্ড প্রতিস্থাপন (Replacement) ফি: ৫০০ টাকা + ভ্যাট।
-
পিন (PIN) প্রতিস্থাপন ফি: ২০০ – ৩০০ টাকা + ভ্যাট।
-
চেক বই ফি: প্রথমটি ফ্রি হতে পারে, তবে পরবর্তীগুলোর জন্য নির্দিষ্ট চার্জ প্রযোজ্য।
-
স্টেটমেন্ট ফি: ই-মেইল স্টেটমেন্ট ফ্রি, তবে হার্ড কপি বা ডুপ্লিকেট কপির জন্য ১০০-২০০ টাকা চার্জ লাগতে পারে।
মার্ক-আপ ফি (Foreign Currency Transaction)
বিদেশি মুদ্রায় কেনাকাটা বা ট্রানজেকশনের ক্ষেত্রে সাধারণত ১% থেকে ২% পর্যন্ত কারেন্সি কনভার্সন বা মার্ক-আপ ফি প্রযোজ্য হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইসলামী ব্যাংক কোনো সুদ (Interest) গ্রহণ করে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে তারা কোনো “চক্রবৃদ্ধি সুদ” আরোপ করে না, তবে চুক্তি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট “পেনাল্টি” বা চ্যারিটি ফান্ডে জমা দেওয়ার জন্য জরিমানা নিতে পারে।
উপসংহার
ইসলামী ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড বা খিদমাহ কার্ড তাদের জন্য সেরা পছন্দ যারা সুদমুক্ত উপায়ে আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা উপভোগ করতে চান। তবে কার্ড নেওয়ার আগে অবশ্যই চার্জ এবং পরিশোধের নিয়মাবলী ভালোভাবে জেনে নেবেন। সময়মতো বিল পরিশোধ করলে আপনি কোনো অতিরিক্ত জরিমানা ছাড়াই এই সেবাটি নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারবেন।

আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।

One Comment