ক্রেডিট কার্ড এর সুবিধা ও অসুবিধা ২০২৬
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
ক্রেডিট কার্ড এর সুবিধা ও অসুবিধা জানা থাকলে একজন ব্যবহারকারী সহজেই সঠিক আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আধুনিক জীবনে কেনাকাটা, অনলাইন পেমেন্ট, ভ্রমণ বুকিং ও জরুরি খরচ মেটাতে ক্রেডিট কার্ড একটি অত্যন্ত সুবিধাজনক মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তবে এর পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার, অতিরিক্ত চার্জ এবং ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই কার্ড ব্যবহারের আগে এর ভালো ও খারাপ দিকগুলো স্পষ্টভাবে জানা জরুরি। এই লেখায় আমরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের বাস্তব সুবিধা ও সম্ভাব্য অসুবিধাগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরব।
ক্রেডিট কার্ড কী?

সহজ কথায়, ক্রেডিট কার্ড হলো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত এমন একটি কার্ড, যা আপনাকে নির্দিষ্ট সীমা (Limit) পর্যন্ত টাকা ধার করার সুযোগ দেয়।
আপনি কার্ড দিয়ে কেনাকাটা বা খরচ করার পর একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে সেই টাকা ব্যাংককে ফেরত দিতে হয়। সঠিক সময়ে টাকা ফেরত দিলে সাধারণত কোনো সুদ দিতে হয় না।
ক্রেডিট কার্ডের সুবিধাসমূহ (Advantages of Credit Card)
সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানলে ক্রেডিট কার্ড আপনার দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে:
১. জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক অর্থ
মানুষের জীবনে বিপদ সবসময় বলে-কয়ে আসে না। হঠাৎ চিকিৎসা খরচ বা জরুরি কোনো প্রয়োজনে যখন হাতে নগদ টাকা থাকে না, তখন ক্রেডিট কার্ড ত্রাতা হিসেবে কাজ করে। এটি আপনাকে তাৎক্ষণিক লিকুইডিটি বা নগদ অর্থের নিশ্চয়তা দেয়।
২. কেনাকাটায় আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট ও অফার
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো বিভিন্ন লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড, রেস্টুরেন্ট এবং ই-কমার্স সাইটে বিশেষ ডিসকাউন্ট। বিশেষ করে ঈদ, পূজা বা বিভিন্ন উৎসবের সময় ক্রেডিট কার্ডে ২০% থেকে ৫০% পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যায়, যা নগদ টাকায় কেনাকাটা করলে পাওয়া সম্ভব নয়।
৩. রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও ক্যাশব্যাক
আপনি যখনই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে খরচ করেন, ব্যাংক আপনাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘রিওয়ার্ড পয়েন্ট’ দেয়। এই পয়েন্টগুলো জমিয়ে পরবর্তীতে আপনি বার্ষিক ফি মওকুফ করতে পারেন কিংবা গিফট ভাউচার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। অনেক কার্ডে আবার নির্দিষ্ট খরচের ওপর ‘ক্যাশব্যাক’ সুবিধাও থাকে।
৪. বিনাসুদে কিস্তিতে কেনাকাটা (EMI)
দামী স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ফ্রিজ কিনতে চাচ্ছেন কিন্তু একসাথে সব টাকা নেই? ক্রেডিট কার্ডের ০% ইএমআই (EMI) সুবিধার মাধ্যমে আপনি বড় কোনো খরচকে কয়েক মাসের ছোট ছোট কিস্তিতে ভাগ করে নিতে পারেন। এর জন্য আপনাকে কোনো অতিরিক্ত সুদ দিতে হয় না।
৫. ক্রেডিট স্কোর তৈরি
ভবিষ্যতে বড় কোনো লোন (যেমন: হোম লোন বা কার লোন) নিতে চাইলে একটি ভালো ক্রেডিট স্কোর থাকা জরুরি। আপনি যদি নিয়মিত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন এবং সময়মতো বিল পরিশোধ করেন, তবে আপনার ক্রেডিট রেকর্ড উন্নত হয়, যা লোন পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করে দেয়।
৬. আন্তর্জাতিক লেনদেন ও অনলাইন কেনাকাটা
বিদেশের ওয়েবসাইট থেকে কেনাকাটা করা, নেটফ্লিক্স বা ইউটিউব সাবস্ক্রিপশন অথবা বিদেশে গিয়ে খরচ করার জন্য ডুয়েল কারেন্সি ক্রেডিট কার্ডের কোনো বিকল্প নেই। এটি আপনাকে মুদ্রা বিনিময়ের ঝামেলা থেকে মুক্তি দেয়।
৭. এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ সুবিধা
অনেক ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে বিনামূল্যে এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা থাকে। দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের বিরতিতে বিনামূল্যে খাবার ও আরামদায়ক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়ার এই সুযোগ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ একটি সুবিধা।
ক্রেডিট কার্ডের অসুবিধাসমূহ (Disadvantages of Credit Card)
সুবিধার পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে, যা অসতর্ক ব্যবহারকারীদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে:
১. উচ্চ সুদের হার
ক্রেডিট কার্ডের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো এর উচ্চ সুদের হার। যদি আপনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত ৪৫ দিন) সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে ব্যাংক আপনার বকেয়া টাকার ওপর চড়া হারে সুদ আরোপ করে, যা বার্ষিক ২৫% থেকে ৩০% বা তারও বেশি হতে পারে।
২. ঋণের ফাঁদ (Debt Trap)
ক্রেডিট কার্ড হাতে থাকলে মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ে। “এখন কিনি, পরে দেখা যাবে”—এই মানসিকতা অনেককে ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দেয়। মাসের পর মাস কেবল ‘মিনিমাম ডিউ’ পরিশোধ করলে মূল ঋণ কমতে চায় না, বরং সুদে-আসলে তা পাহাড়সম হয়ে দাঁড়ায়।
৩. লুকানো খরচ বা হিডেন চার্জেস
ক্রেডিট কার্ডের সাথে বিভিন্ন ধরণের ফি যুক্ত থাকে। যেমন: বার্ষিক ফি (Annual Fee), লেট পেমেন্ট ফি, ওভার লিমিট ফি এবং ক্যাশ উইথড্রয়াল ফি। অনেক সময় গ্রাহক এই চার্জগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না, যা পরে আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়।
৪. কার্ড জালিয়াতি ও সাইবার ঝুঁকি
ডেবিট কার্ডের তুলনায় ক্রেডিট কার্ডে জালিয়াতির ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। অনলাইনে কার্ডের তথ্য চুরি হলে বা কার্ড হারিয়ে গেলে আপনার অজান্তেই বড় অংকের অর্থ লেনদেন হয়ে যেতে পারে। যদিও বর্তমানে ওটিপি (OTP) বা টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন এই ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দিয়েছে।
৫. নগদ টাকা উত্তোলনে উচ্চ খরচ
ক্রেডিট কার্ড দিয়ে এটিএম থেকে নগদ টাকা উত্তোলন করা খুবই ব্যয়বহুল। টাকা তোলার সাথে সাথেই এর ওপর উচ্চ হারে সুদ গণনা শুরু হয় এবং একটি নির্দিষ্ট প্রসেসিং ফি-ও দিতে হয়। তাই ক্রেডিট কার্ডকে এটিএম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের আদর্শ নিয়ম
ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা ভোগ করতে এবং অসুবিধাগুলো এড়িয়ে চলতে নিচের টিপসগুলো অনুসরণ করুন:
-
পূর্ণ বিল পরিশোধ: সবসময় চেষ্টা করুন বিলের শেষ তারিখের মধ্যে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে। শুধুমাত্র ‘মিনিমাম ডিউ’ দিয়ে বিল আটকে রাখবেন না।
-
বাজেট মেনে চলা: আপনার মাসিক আয়ের কত শতাংশ ক্রেডিট কার্ডে খরচ করবেন, তার একটি লিমিট নিজে নিজেই ঠিক করে নিন। আয়ের ৩০%-এর বেশি কার্ডে খরচ না করাই ভালো।
-
অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বর্জন: “ডিসকাউন্ট আছে” বলেই কোনো কিছু কিনবেন না। কেনার আগে ভাবুন সেটি আপনার আসলেই প্রয়োজন কি না।
-
নগদ টাকা না তোলা: একান্ত নিরুপায় না হলে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে এটিএম থেকে ক্যাশ উত্তোলন করবেন না।
-
স্টেটমেন্ট যাচাই: প্রতি মাসে আপনার ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট ভালো করে চেক করুন। কোনো ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত চার্জ দেখলে সাথে সাথে ব্যাংকে যোগাযোগ করুন।
উপসংহার
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার সঠিকভাবে করলে এটি আপনার দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সুবিধাজনক ও আরামদায়ক করতে পারে। জরুরি খরচ, অনলাইন কেনাকাটা, ক্যাশব্যাক, রিওয়ার্ড পয়েন্ট এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনসহ অসংখ্য সুবিধা পাওয়া যায়।
তবে এর সাথে উচ্চ সুদের হার, ঋণের ফাঁদ এবং লুকানো চার্জের মতো অসুবিধাও রয়েছে। তাই ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার আগে নিজের প্রয়োজন ও শোধ করার ক্ষমতা বিচার করুন এবং ব্যাংকের শর্তাবলি ভালোভাবে পড়ে নিন।

আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
