ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড: কিভাবে পাবো, চার্জ, সুবিধা
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক লেনদেন ও অনলাইন কেনাকাটাকে আরও সহজ করতে ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড একটি আধুনিক ও কার্যকর সমাধান।
এই কার্ডের মাধ্যমে একই সঙ্গে বাংলাদেশি টাকা (BDT) এবং বৈদেশিক মুদ্রা (USD) ব্যবহার করে দেশ-বিদেশে নিরাপদ লেনদেন করা যায়। বিশেষ করে যারা বিদেশ ভ্রমণ করেন, অনলাইন শপিং করেন বা আন্তর্জাতিক সেবা গ্রহণ করেন, তাদের জন্য ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড অত্যন্ত উপযোগী।
আজকের ব্লগে ইসলামী ব্যাংকের ডুয়েল কারেন্সি কার্ডের প্রকারভেদ, সুবিধা, চার্জ এবং এটি পাওয়ার উপায় নিয়ে আদ্যোপান্ত আলোচনা করব।
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ডের প্রকারভেদ
ইসলামী ব্যাংক মূলত তিন ধরনের কার্ডে ডুয়েল কারেন্সি সুবিধা প্রদান করে থাকে:
ক) খিদমাহ ক্রেডিট কার্ড (Khidmah Credit Card)
এটি ইসলামী ব্যাংকের একটি সিগনেচার প্রোডাক্ট। এটি মূলত একটি ক্রেডিট কার্ড যা শরীয়াহর ‘উযরাহ’ (Ujrah) মডেলে পরিচালিত। সিলভার, গোল্ড, প্লাটিনাম এবং সিগনেচার- এই চারটি ক্যাটাগরিতে এটি পাওয়া যায়। এই কার্ডের মাধ্যমে আপনি দেশের বাইরে কেনাকাটা এবং হোটেল বুকিং অনায়াসেই করতে পারবেন।
খ) ডুয়েল কারেন্সি ডেবিট কার্ড (Dual Currency Debit Card)
আপনার যদি ইসলামী ব্যাংকে একটি সেভিংস বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে আপনি প্লাটিনাম বা গোল্ড ডেবিট কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের স্মার্ট ডেবিট কার্ডগুলো ডুয়েল কারেন্সি সাপোর্টেড।
গ) প্রিপেইড কার্ড (Prepaid Card)
যাদের ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই, তারাও এই কার্ডটি নিতে পারেন। এটি মূলত একটি ‘লোড অ্যান্ড ইউজ’ কার্ড। টাকা লোড করবেন এবং কার্ডটি ব্যবহার করবেন। ফ্রিল্যান্সার এবং অনলাইন শপারদের কাছে এটি বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড কিভাবে পাবো?
একটি ডুয়েল কারেন্সি কার্ড পাওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে এবং আপনার একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকতে হবে। পাসপোর্ট ছাড়া ডুয়েল কারেন্সি সুবিধা (ডলার পার্ট) অ্যাক্টিভেট করা সম্ভব নয়।
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড করতে কি কি লাগে?
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
-
আবেদনকারীর ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
-
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর ফটোকপি।
-
বৈধ পাসপোর্টের ফটোকপি (ডলার এনডোর্সমেন্টের জন্য বাধ্যতামূলক)।
-
ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেক বইয়ের পাতা (ডেবিট কার্ডের ক্ষেত্রে)।
-
ইনকাম প্রুফ বা স্যালারি সার্টিফিকেট (ক্রেডিট কার্ড বা খিদমাহ কার্ডের ক্ষেত্রে)।
-
টিন (TIN) সার্টিফিকেটের কপি।
ডলার এনডোর্সমেন্ট এবং অ্যাক্টিভেশন পদ্ধতি
কার্ড হাতে পেলেই কিন্তু আপনি ডলার খরচ করতে পারবেন না। এর জন্য আপনাকে ডলার এনডোর্সমেন্ট করতে হবে।
ধাপসমূহ:
-
ব্যাংকে যোগাযোগ: আপনার পাসপোর্ট এবং কার্ড নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের যেকোনো শাখায় (বিশেষ করে যেখানে এডি শাখা বা অথরাইজড ডিলার রয়েছে) যোগাযোগ করুন।
-
ফরম পূরণ: ডলার এনডোর্সমেন্টের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হবে।
-
কোটা নির্ধারণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বছরে সর্বোচ্চ ১২,০০০ মার্কিন ডলার খরচ করতে পারেন। আপনি আপনার পাসপোর্টে এই লিমিটটি এনডোর্স করিয়ে নেবেন।
-
সেলফিন থেকে সেশন অন: কার্ড এনডোর্স হয়ে গেলে সেলফিন অ্যাপের মাধ্যমে ‘E-commerce’ এবং ‘International’ সেশনটি অন করে নিলেই আপনি পেমেন্ট করতে পারবেন।
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড এর সুবিধাসমূহ
আপনি যখন একটি ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড হাতে পাবেন, তখন নিচের সুবিধাগুলো উপভোগ করতে পারবেন:
-
আন্তর্জাতিক ই-কমার্স: ফেসবুক অ্যাড বুস্টিং, নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রিপশন, গুগল প্লে-স্টোর থেকে অ্যাপ কেনা বা আমাজন-আলিবাবা থেকে পণ্য কেনার পেমেন্ট দেওয়া যাবে।
-
ভ্রমণ সুবিধা: বিদেশ ভ্রমণের সময় নগদ ডলার বহন করার ঝুঁকি নেই। বিদেশের যেকোনো এটিএম থেকে স্থানীয় মুদ্রা উত্তোলন করা যায়।
-
ডিসকাউন্ট অফার: দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামী রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল এবং শপিং মলে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট ও বাই-ওয়ান-গেট-ওয়ান (B1G1) অফার থাকে।
-
লকার সুবিধা: কার্ড হোল্ডারদের জন্য বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাংক লকার সুবিধায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ডের চার্জ এবং ফি ২০২৬
ব্যাংকিং সেবায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ইসলামী ব্যাংক তাদের চার্জের তালিকা নিয়মিত আপডেট করে।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ডের চার্জসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
| কার্ডের ধরন | ইস্যু ফি (Issuance Fee) | বার্ষিক ফি (Annual Fee) | ডলার এনডোর্সমেন্ট চার্জ |
| ডেবিট কার্ড (Classic) | ফ্রি | ৫০০ টাকা + ভ্যাট | ফ্রি |
| প্রিপেইড কার্ড | ৫০০ টাকা + ভ্যাট | নেই | ফ্রি |
| খিদমাহ গোল্ড কার্ড | ১৫০০-২০০০ টাকা | ১৫০০ টাকা + ভ্যাট | ফ্রি |
| খিদমাহ প্লাটিনাম | ৩০০০ টাকা | ৩০০০ টাকা + ভ্যাট | ফ্রি |
দ্রষ্টব্য: ভ্যাট বর্তমান সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১৫% প্রযোজ্য হবে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ১% থেকে ৩% পর্যন্ত কনভার্সন রেট প্রযোজ্য হতে পারে।
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড ব্যবহারে কিছু জরুরি সতর্কতা
অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। আপনার কার্ডটি সুরক্ষিত রাখতে নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলুন:
-
ওটিপি (OTP) শেয়ার করবেন না: লেনদেনের সময় ফোনে আসা ওটিপি বা কার্ডের পিন (PIN) কাউকে বলবেন না। ব্যাংক কর্মকর্তারাও আপনার কাছে এই তথ্য চাইবেন না।
-
অপরিচিত লিংকে ক্লিক করবেন না: ফেসবুক বা ইমেইলে আসা কোনো সন্দেহজনক লিংকে কার্ডের তথ্য দেবেন না।
-
সিভিভি (CVV) গোপন রাখুন: কার্ডের পেছনে থাকা ৩ ডিজিটের সিভিভি নম্বরটি সবসময় গোপন রাখুন।
-
সেশন ম্যানেজমেন্ট: যখন আন্তর্জাতিক লেনদেন করবেন না, তখন সেলফিন অ্যাপ থেকে ‘International Transaction’ অপশনটি অফ করে রাখুন।
FAQS
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড কি অনলাইন পেমেন্টে ব্যবহার করা যায়?
হ্যাঁ, এই কার্ড দিয়ে ফেসবুক অ্যাড বুস্টিং, গুগল, নেটফ্লিক্স, আমাজন, আলিবাবা সহ আন্তর্জাতিক সব ই-কমার্স ওয়েবসাইটে নিরাপদে পেমেন্ট করা যায়, যদি ইন্টারন্যাশনাল ও ই-কমার্স সেশন অন করা থাকে।
পাসপোর্ট ছাড়া কি ডুয়েল কারেন্সি কার্ড নেওয়া বা ব্যবহার করা সম্ভব?
কার্ড নেওয়া সম্ভব হলেও ডলার পার্ট (USD) অ্যাক্টিভেট করতে অবশ্যই বৈধ পাসপোর্ট এবং ডলার এনডোর্সমেন্ট প্রয়োজন। পাসপোর্ট ছাড়া আন্তর্জাতিক লেনদেন করা যাবে না।
বছরে সর্বোচ্চ কত ডলার খরচ করা যায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি বছরে সর্বোচ্চ ১২,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে পারবেন, যা পাসপোর্টে এনডোর্স করা হয়।
ডুয়েল কারেন্সি কার্ডে কি অতিরিক্ত চার্জ কাটে?
দেশীয় লেনদেনে কোনো অতিরিক্ত চার্জ নেই। তবে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণত ১%-৩% কারেন্সি কনভার্সন চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে, যা ভেন্ডর ও কার্ড টাইপ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
কার্ড হারিয়ে গেলে বা সন্দেহজনক লেনদেন হলে কী করবেন?
তাৎক্ষণিকভাবে সেলফিন অ্যাপ থেকে কার্ড ব্লক করুন এবং নিকটস্থ ইসলামী ব্যাংক শাখা বা কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করুন। দ্রুত রিপোর্ট করলে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি কমে যায়।
উপসংহার
ইসলামী ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি কার্ড আধুনিক ব্যাংকিংয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ। আপনি ফ্রিল্যান্সার হোন, ব্যবসায়ী হোন কিংবা ভ্রমণপিপাসু, এই কার্ড আপনার লেনদেনকে সহজ ও গ্লোবাল করে তুলবে। বিশেষ করে সেলফিন অ্যাপের মাধ্যমে কার্ড ম্যানেজমেন্টের সুবিধা থাকায় এটি ব্যবহার করা অত্যন্ত সহজ।
আপনি যদি এখনো কার্ডটি না নিয়ে থাকেন, তবে আজই আপনার নিকটস্থ ইসলামী ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন।

আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
