টিন সার্টিফিকেট জিরো রিটার্ন ২০২৬
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
টিন সার্টিফিকেট জিরো রিটার্ন বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেকেই অকারণে ভয় বা বিভ্রান্তিতে ভোগেন। টিন সার্টিফিকেট থাকলেই যে অবশ্যই সরকারকে ট্যাক্স দিতে হবে- এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।
আপনার বার্ষিক আয় যদি সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার নিচে থাকে, তাহলে ট্যাক্স দিতে না হলেও আপনাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে, যাকে বলা হয় জিরো রিটার্ন।
২০২৬ সালে অনলাইন সিস্টেম আরও সহজ হওয়ায় ঘরে বসেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। এই লেখায় টিন সার্টিফিকেট জিরো রিটার্ন সংক্রান্ত নিয়ম, শর্ত ও দাখিল পদ্ধতি সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জিরো রিটার্ন কি?
জিরো রিটার্ন বলতে এমন আয়কর বিবরণীকে বোঝায়, যেখানে করদাতা তার সারা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কাছে জমা দেন, কিন্তু মোট আয় সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার নিচে থাকায় কোনো আয়কর বা ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয় না। অর্থাৎ আয় থাকলেও করযোগ্য না হলে যে রিটার্ন দাখিল করা হয়, সেটিই জিরো রিটার্ন নামে পরিচিত।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পুরুষ করদাতার বার্ষিক আয় যদি ৩,৫০,০০০ টাকার নিচে হয় (নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৪,০০,০০০ টাকা), তবে তাকে কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না। তবে টিন সার্টিফিকেট থাকলে আইন অনুযায়ী এই ‘শূন্য’ হিসাবটি দাখিল করা বাধ্যতামূলক।
টিন সার্টিফিকেট জিরো রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম

অনেকে ভাবেন জিরো রিটার্ন শুধু একবার জমা দিলেই কাজ শেষ। কিন্তু নিয়ম হলো, আপনার যদি টিন সার্টিফিকেট থাকে এবং আপনি যদি করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হন, তবে প্রতি বছর আপনাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
টিন সার্টিফিকেট জিরো রিটার্ন আবেদন করার সাধারণ শর্তাবলী:
-
১. আপনার একটি সক্রিয় ই-টিন (e-TIN) থাকতে হবে।
-
২. আপনার নামে নিবন্ধিত সিম কার্ড থাকতে হবে (যা বায়োমেট্রিক করা)।
-
৩. পূর্ববর্তী অর্থবছরের (জুলাই থেকে জুন) আয় ও সম্পদের হিসাব থাকতে হবে।
যদি আপনার আয় করযোগ্য সীমার নিচে হয়, তবে আপনি অফলাইনে ফরম পূরণ করে আপনার সার্কেল অফিসে জমা দিতে পারেন অথবা অনলাইনে জমা দিতে পারেন। বর্তমান সময়ে অনলাইন পদ্ধতিটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ঝামেলামুক্ত।
অনলাইনে জিরো রিটার্ন দাখিলের নিয়ম
অনলাইনে জিরো রিটার্ন দাখিল করা অত্যন্ত সহজ।
নিচে ধাপগুলো দেওয়া হলো:
-
রেজিস্ট্রেশন: প্রথমে etaxnbr.gov.bd পোর্টালে গিয়ে আপনার টিন নম্বর এবং বায়োমেট্রিক করা মোবাইল নম্বর দিয়ে ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে পাসওয়ার্ড সেট করে নিন।
-
লগইন: আপনার টিন নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে ড্যাশবোর্ডে প্রবেশ করুন।
-
রিটার্ন সাবমিশন মেনু: মেনু থেকে ‘Return Submission’ অপশনে ক্লিক করুন।
-
তথ্য পূরণ: এখানে আপনাকে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে (যেমন: আপনি কি চাকরিজীবী? আপনার কি কোনো করযোগ্য আয় আছে? ইত্যাদি)। জিরো রিটার্নের ক্ষেত্রে অধিকাংশ উত্তর ‘No’ হবে।
-
আয় ও সম্পদ বিবরণী: আপনার যদি কোনো স্থায়ী সম্পদ (জমি বা ফ্ল্যাট) বা ব্যাংক ব্যালেন্স থাকে, তার তথ্য দিন। যেহেতু আয় কম, তাই ট্যাক্স ক্যালকুলেশন অংশে আপনার প্রদেয় কর ‘0’ (শূন্য) দেখাবে।
-
সাবমিট: সবকিছু ঠিক থাকলে ডিজিটাল সিগনেচার বা কনফার্মেশন দিয়ে সাবমিট করুন। সাবমিট করার পর আপনি একটি একনলেজমেন্ট স্লিপ (Acknowledgment Receipt) পাবেন, যা আপনার রিটার্ন জমার প্রমাণ।
চাকরিজীবী জিরো রিটার্ন

বেসরকারি বা সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে চাকরির শর্ত হিসেবে টিন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়। অনেক সময় বেতন কম হওয়া সত্ত্বেও টিন থাকার কারণে রিটার্ন জমা দিতে হয়।
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে জিরো রিটার্ন জমার সময় বাড়তি কিছু তথ্যের প্রয়োজন হয়:
-
সারা বছরের মোট বেতনের হিসাব।
-
অফিস থেকে প্রাপ্ত স্যালারি সার্টিফিকেট (যদি থাকে)।
-
অফিস থেকে যদি কোনো ট্যাক্স না কাটা হয়ে থাকে এবং মোট বার্ষিক আয় ৩,৫০,০০০ টাকার নিচে হয়, তবেই এটি জিরো রিটার্ন হিসেবে গণ্য হবে।
চাকরিজীবীদের জন্য সুবিধা হলো, তারা চাইলে অনলাইনে খুব সহজেই তাদের আয়ের সোর্স ‘Salary’ সিলেক্ট করে এই ফরমটি পূরণ করতে পারেন।
জিরো রিটার্ন দাখিলের সময়
বাংলাদেশে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। সাধারণত ১ জুলাই থেকে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন অর্থবছর শুরু হলেও রিটার্ন জমার মূল সময় হলো ১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।
এই ৩০ নভেম্বর দিনটিকে বলা হয় ‘ট্যাক্স ডে’। জিরো রিটার্ন হোক বা রেগুলার রিটার্ন—এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা না দিলে জরিমানা বা বিলম্বে দাখিলের জন্য অনুমতি নিতে হতে পারে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার এই সময় বৃদ্ধি করে থাকে।
জিরো রিটার্ন দাখিল ফরম
আপনি যদি অনলাইনে না দিয়ে সরাসরি অফিসে ফরম জমা দিতে চান, তবে আপনাকে নির্দিষ্ট কিছু ফরম ব্যবহার করতে হবে।
-
IT-11GA (২০২৩): বর্তমানে এনবিআর একটি সহজ এক পাতার ফরম চালু করেছে যারা শুধু জিরো রিটার্ন দাখিল করতে চান বা যাদের সম্পদ কম।
-
ফরমের অংশসমূহ: এই ফরমে সাধারণত করদাতার নাম, টিন নম্বর, আয়ের উৎস, মোট সম্পদ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিতে হয়।
উদাহরণ: জিরো রিটার্ন দাখিল ফরম (এক পাতা)
ব্যক্তিগত তথ্য অংশ:
-
করদাতার নাম: মোঃ আনিসুর রহমান
-
টিন (TIN) নম্বর: ১২৩৪-৫৬৭৮-৯১০১
-
কর সার্কেল: ১৮৫
-
কর অঞ্চল: ১০, ঢাকা।
-
আবাসিক মর্যাদা: নিবাসী (Resident)
আয়ের বিবরণ (Income Details)
এখানে আপনি গত এক বছরে (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) কত টাকা আয় করেছেন তার সংক্ষিপ্ত রূপ দিতে হবে।
| আয়ের উৎস | আয়ের পরিমাণ (টাকা) |
| ১. বেতন (Salary) | ৩,১০,০০০/- |
| ২. ব্যবসা (Business) | ০/- |
| ৩. অন্যান্য (Others) | ২০,০০০/- |
| মোট আয় (Total Income) | ৩,৩০,০০০/- |
দ্রষ্টব্য: যেহেতু মোট আয় ৩,৫০,০০০ টাকার নিচে, তাই এটি জিরো রিটার্ন হিসেবে গণ্য হবে।
২. কর নিরূপণ (Tax Calculation)
যেহেতু আপনার আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তাই এই অংশটি হবে নিম্নরূপ:
| বিবরণ | টাকার পরিমাণ |
| ১. মোট আয়ের ওপর আরোপযোগ্য কর | ০.০০ (Nil) |
| ২. কর রেয়াত (যদি থাকে) | ০.০০ |
| ৩. প্রদেয় নিট কর (Net Tax Payable) | ০.০০ |
৩. সম্পদ ও জীবনযাত্রার ব্যয় (Net Wealth & Lifestyle)
জিরো রিটার্ন হলেও আপনার বর্তমান সম্পদের একটি আনুমানিক ধারণা দিতে হয়।
-
মোট সম্পদের পরিমাণ: ৫,০০,০০০/- (যেমন: ব্যাংকে জমা বা ডিপিএস)
-
পারিবারিক খরচ: ২,৪০,০০০/- (সারা বছরের থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য ব্যয়)
৪. যাচাই ও স্বাক্ষর (Verification)
আমি মোঃ আনিসুর রহমান, পিতা: মৃত আব্দুল লতিফ, ঘোষণা করছি যে এই ফরমে প্রদত্ত তথ্য আমার জ্ঞান ও বিশ্বাস মতে সত্য ও সম্পূর্ণ।
তারিখ: ১৫ অক্টোবর, ২০২৫ স্বাক্ষর: (আপনার স্বাক্ষর)
জিরো রিটার্ন ফরমের বিশেষ নোট:
-
সম্পদের সীমা: আপনার মোট সম্পদ যদি ৪০ লক্ষ টাকার উপরে হয় বা আপনি যদি নিজের নামে গাড়ি বা ফ্ল্যাট এর মালিক হন, তবে আপনাকে এই ১ পাতার ফরমের বদলে বিস্তারিত IT-10B (সম্পদ ও দায় বিবরণী) ফরম পূরণ করতে হবে।
-
সংযুক্তি: ফরমের সাথে আপনার এনআইডি (NID) কার্ডের ফটোকপি এবং আয়ের সোর্স (যেমন স্যালারি সার্টিফিকেট বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট) সংযুক্ত করা ভালো।
জিরো রিটার্ন দাখিল না করার ঝুঁকি
অনেকেই ভাবেন, “আমার তো ইনকাম নেই, রিটার্ন দিয়ে কী হবে?” এটি একটি বড় ভুল।
১. জরিমানা: সময়মতো রিটার্ন না দিলে মোটা অংকের জরিমানা হতে পারে।
২. লাইসেন্স বাতিল: আপনার ট্রেড লাইসেন্স বা গাড়ির ফিটনেস আটকে যেতে পারে।
৩. সুবিধা বঞ্চিত: ব্যাংক লোন বা ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার রিটার্ন জমার স্লিপ প্রয়োজন হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ই রিটার্ন রেজিস্ট্রেশন কি?
ই-রিটার্ন রেজিস্ট্রেশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে আপনি এনবিআর-এর অফিসিয়াল পোর্টালে নিজের টিন নম্বর এবং মোবাইল নম্বর দিয়ে একটি পার্সোনাল প্রোফাইল তৈরি করবেন। এই পোর্টালে একবার রেজিস্ট্রেশন করলে আপনি প্রতি বছর ঘরে বসেই নিজের রিটার্ন সাবমিট করতে পারবেন এবং এক নিমিষেই ট্যাক্স সার্টিফিকেট ডাউনলোড করতে পারবেন।
জিরো রিটার্ন কি প্রতি বছর জমা দিতে হয়?
হ্যাঁ। আপনার টিন সার্টিফিকেট সক্রিয় থাকলে এবং আপনি করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হলে, আয় শূন্য বা করমুক্ত সীমার নিচে হলেও প্রতি অর্থবছর জিরো রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক।
জিরো রিটার্ন অনলাইনে জমা দিলে কি অফিসে যেতে হয়?
না। অনলাইনে সফলভাবে রিটার্ন সাবমিট করলে আলাদা করে কর অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। অনলাইন একনলেজমেন্ট স্লিপই রিটার্ন জমার বৈধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়।
জিরো রিটার্ন জমা দিলে কি ভবিষ্যতে ট্যাক্স দিতে সমস্যা হবে?
না। জিরো রিটার্ন জমা দিলে ভবিষ্যতে ট্যাক্স দিতে কোনো সমস্যা হয় না। বরং এটি আপনার আয়কর হিস্ট্রি পরিষ্কার রাখে এবং ভবিষ্যতে আয় বাড়লে নিয়মিত রিটার্ন দিতে সুবিধা হয়।
যাদের কোনো আয় নেই, তারাও কি জিরো রিটার্ন দাখিল করবে?
যদি আপনার টিন সার্টিফিকেট থাকে, তাহলে আয় না থাকলেও জিরো রিটার্ন দাখিল করা উচিত। এতে আইনগত জটিলতা এড়ানো যায় এবং ভবিষ্যতে ব্যাংক বা সরকারি কাজে কোনো বাধা আসে না।
শেষ কথা
টিন সার্টিফিকেট থাকলে জিরো রিটার্ন দেওয়া মোটেও ভয়ের কিছু নয় বরং এটি একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। অনলাইনে এখন কয়েক মিনিটেই এই কাজ সম্পন্ন করা যায়। তাই দেরি না করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আপনার জিরো রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করুন।

আমি আসিফ মাহমুদ, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ (অনার্স) পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন নাগরিক সেবা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য ব্লগ লিখি। আমার লক্ষ্য জটিল আর্থিক ও সরকারি সেবা প্রক্রিয়া সহজভাবে তুলে ধরে পাঠকদের সময় ও ঝামেলা কমানো।
